- "তোমাকে বিয়ে করলে আমাকে সারাজীবন চাকরি করতে হতো, ওকে বিয়ে করলে আমার চাকরি না করলেও চলবে।"
ভাল্কিমাচানের জঙ্গলে ঢুকবার আগেই পুরোনো ইট বার হয়ে যাওয়া মাচানের তলায় সুরঙ্গের দিকে চেয়ে কয়েক মুহুর্তের জন্যে হারিয়ে গিয়েছিলো বুদ্ধুরাম। কথাগুলো মনে পড়লেই অদ্ভুত একটা কষ্ট হয়। বর্দ্ধমান থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের বাঁ পাশ কাটিয়ে এমন একটা সবুজঘেরা জায়গাতে এসেও পিছু ছাড়ে না কথাগুলো।
বেশ কয়েকমাস হয়ে গেছে ছুটি আর বুদ্ধুরামের সাথে নেই। বাড়িতে ক্ষীন আপত্তির বাঁধা পেরিয়ে যখন আরেকবার ছুটিকে কাছে পেতে চেয়েছিলো, তখনই কথাগুলো শুনতে হয়েছিল বুদ্ধুরামকে। কথাগুলো যেন কানে সীসে ঢেলে ছিল। হ্যাঁচকা টানে বিভাস সেদিন যদি বুদ্ধুরামকে মাঝরাস্তা থেকে টেনে না আনত, তাহলে নির্ঘাত এতদিনে দেওয়ালে ছবি হয়ে শোভা পেত। মোবাইলটা ছিটকে পড়েছিল রাস্তায়। ফের তা কুড়োতে যেতে গিয়ে রে রে করে আবার চারপাশ থেকে ছুটে এসেছিলো গাড়ির ঝাঁক।
তারপর বন্ধুরা মিলে বুদ্ধুরামকে অনেক বুঝিয়েছে। ছুটি কোনদিনও তোকে সত্যিকারের ভালোবাসেনি। তোকে টাইম-পাস হিসেবে নিয়েছিলো। সত্যিকারের ভালোবাসলে তোকে কোনদিনও ছেড়ে যেতে পারতো না। অন্তত বাড়িতে বাঁধা দিত, ঝগড়া করতো, জোর করতো। ও কি তোকে কোন সুযোগ দিয়েছে! বাড়ির সাথে কথা বলিয়েছে! বাচ্চা মেয়ে তো নয়! তোকে যদি ও সত্যিই ভালোবাসতো তাহলে কখনও বলতে পারতো না যে তোকে বিয়ে করলে ওকে সারাজীবন চাকরি করতে হবে! তোর থেকে অনেক কম রোজগার করে, তারা কি সংসার করে না! বরঞ্চ উল্টোটা ভাব। ভালোবেসে সংসার করবার জন্যেই দু’জনে চাকরি করতে চায়! আসলে ও তোকে অপসন হিসেবে রেখে ছিল, যদি বাড়ি থেকে দেখা ছেলের পরিবার রাজি না হয়, তাহলে ও তোর কথা ভাববে।
বুদ্ধুরাম কোন উত্তর দিতে পারেনি। সত্যি মিথ্যে জানে না, কিন্তু কথাগুলো সত্যির মতই। এমনকি ছুটি প্রায় কারোর কাছে স্বীকারও করেনি যে ও বুদ্ধুরামকে ভালোবাসে। ব্রেক-আপ হতেই পারে নানান কারণে, কিন্তু যে ভালবাসার কথা স্বীকারও করতে পারে না, সে কি সত্যিই ভালোবেসেছিলো নাকি পুরোটাই ফাঁকা সময়ে, মনের খিদে মেটাবার জন্যে মিথ্যে সম্পর্কের জাল বুনে গেছে। উল্টে ছুটি অনেককেই বোঝাবার চেষ্টা করেছে, যে বুদ্ধুরামই নাকি ওর পিছনে পরে আছে। এত ভালবাসার কি আছে, বুঝি না বাবা, আমি তো ওকে বন্ধুর মতই দেখি!
মনে মনে হাসে বুদ্ধুরাম। ভাল্কিমাচানের জঙ্গলে এর চাইতে হারিয়ে যাওয়া বোধহয় সহজ। ছুটির মা নাকি ছুটিকে বুঝিয়েছিলো, বন্ধুত্ব পর্যন্তই সম্পর্কটা ঠিক আছে, আর চাকরিটাও চেন্জ করতে হবে.. এখন বুদ্ধুরাম বোঝে; চাকরিটাই মুখ্য, ভালবাসা সেখানে গৌন! মা জানতেন, আর ছুটি সেই যুক্তি জানতো না! টাকা, নাম-করা কোম্পানি, আর চাকরিটাই আসল; ভালবাসা পেঁয়াজের খোসার মতই ঝরতে লাগে সেখানে!
ওপাশ থেকে অতনু সাড়া দেয়, 'ভেতরে পথ হারিয়ে ফেলবো না তো!' হারিয়ে ফেললেই বা কি! বুদ্ধুরামের আর কিছু যায় আসে না| গুপ্তধনের সন্ধানে তো আর আসেনি। এসেছে নিছক বেড়াতে। ওদিক থেকে আরেকটা আওয়াজ ভেসে আসে, 'এখান থেকে বেরিয়ে অরণ্যসুন্দরী-তে খাওয়া দাওয়া সেরে আবার ফিসারিজ-এ যেতে হবে কিন্তু। এখানেই দুপুর গড়িয়ে দিস না!'
ভাল্কিমাচানের একমাত্র হোটেল অরণ্যসুন্দরী-তে দুপুরের খাওয়া সেরে দুর্গাপুর হাইওয়ের দিকে চার কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গ ফিসারিজ। মাছের চাষের উপযোগী ছোট ছোট ঝিল। চারপাশ দিয়ে রাস্তা। অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশে ছোট্ট একটা গ্রাম। মাছের সাথে হাঁসেরাও খেলা করছে সেই ঝিলে। সবার সামনে দিয়েই এক ঝিল থেকে আরেক ঝিলে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে হাঁসেরা। ওরাও বোঝে ভালবাসা, জানে এরা ওদের কোন ক্ষতি করতে আসেনি। শেষ বিকেলের আলো জলে পরে ঝিকমিক করছে, হীরের দ্যুতি ছিটকোচ্ছে। মৌরিফুলে শিহরণ তুলে ছিনিমিনি ছন্দে একসময় চারপাশে সন্ধ্যে নেমে আসছে ধীরে ধীরে। বুদ্ধুরাম পাহারাদার মাচায় বসে একবার ভাবে, এই গুলি সত্যি, নাকি সহবাসের পর অন্ধকার ঘরে এরকমই হীরে জহরতের স্বাচ্ছন্দে ছিটকানো দ্যুতি ভুলিয়ে দেয় মোড়কে রাখা ভালোবাসাকে।
সোমাদি একবার বলেছিলো, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। তবু মনের জানলাটা খোলা রাখিস। বলা যায় না যদি কোন নাছোড় হাওয়া জানলা খোলা পেয়ে ঢুকে পরেও তো এলোমেলো করে দিতে পারে। আবার তো নতুন করে গুছিয়ে নিতেই হবে তখন। অসীম রোদ্দুরে পুড়ে যাওয়া বিস্বাদ নিয়ে চলকে ওঠা অশ্রুরা খেলা করে। কে যেন গভীর ওই ঝিলের তলদেশ ছোঁয়ার অচেনা অনুভুতি সাজিয়েছে, জ্যোত্স্নার লুটিয়ে পড়া দেখে মনে হয় আরেকবার এইরকম আলতো ছুঁয়ে দেখতে।
আজ হয়তো ছুটি বুদ্ধুরামের আসল নামটাই ভুলে যেতে বসেছে। সাত সুরের সব সুর আর কতজন মনে রাখে! গান শোনাটাই মুখ্য। রাগ-রাগিনীতে কিছু যায় আসে না আজকালকার দিনে। অতনু আরেকবার আওয়াজ দেয়, 'বেশি অন্ধকার হয়ে গেলে হাইওয়েতে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হবে কিন্তু, দেরি হবে।' বুদ্ধুরাম মনে মনে ভাবে, হোক দেরি। কত আর দেরি হবে! সারাদিন ক্লান্তির পর বাড়ি ফিরেই তো বিছানার ডাক, আর ঘুম না আসা।
মাচা থেকে নেমে বুদ্ধুরাম একবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। উঁহু ছুটি নয়, হেঁটে চলা নিজের জন্যেই। প্রকৃতি আর নারীকে মেলাতে চেয়েছিলো। মেলানো যায় না। নারী প্রকৃতির মত হতে পারে, প্রকৃতি হয়ে যায় না। প্রকৃতি নিজেই হীরের দ্যুতি তৈরী করে, আর নারী সেই দ্যুতির লোভে স্বাচ্ছন্দ খোঁজে। সত্যি; বুদ্ধুরামকে ছুটি সত্যি সত্যিই বুদ্ধু বানিয়ে ছেড়েছে। ভাগ্যিস, ছুটির আদরের ডাকনামে তাকে তো আর কেউ চেনে না!!