Friday, November 14, 2014

তিন টাকার বেলুন কিংবা...

চারপাশে আবার শারদ বারতা| নতুন জামা-কাপড় আর সুগন্ধী ছড়িয়ে যাচ্ছে আসে পাশে| ট্রেনে যেতে যেতে রেল লাইনের পাশে মাঝে মাঝে কিছু কাশফুলের হঠাত হাওয়ার ঝাপটায় দুলে ওঠা ভেসে ধানক্ষেত পার হয়ে আরও দুরে| মনে হয় কয়েকদিনের ছুটিতে পাওয়া এই প্রাপ্তিই বা কম কিসে! ছোট ছেলেটার ডাক স্তম্বিত ফিরিয়ে দেয় – চালের পাপড়, মাত্র তিন টাকা প্যাকেট|

    যার নতুন জামা-প্যান্ট পরে হাতে বেলুন বা পকেটে ক্যাপ ফাটানো বন্দুক নিয়ে ছুটোছুটি করার কথা; চালের পাপড় নিয়ে পসার সাজিয়েছে সে ট্রেনের কামরায়| কেউ কেনে, কেউ কেনে না| স্টেশন আসে| হারিয়ে যায় অন্য কামরায়|

    আমরাও নগরায়নের যুগে হারিয়ে যেতে দেখছি ক্রমশঃ কাশফুল| আকাশে ছেড়া মেঘের সারি দেখার জন্য মাথা তুলে ফাঁক ফোকর খুজতে হচ্ছে| হাতে গোনা সাবেকি পুজোও ক্রমশঃ ম্লান হয়ে আসছে| প্রচার আর গিমিকের যুগে এখন সপ্তাশ্চর্যের হাতছানি| কোথাও ঘাসের প্যান্ডেল, কোথাও সন্জিবনির, কোথাও ভাড়ের, কোথাও বা কাঁচের| মূর্তি পুজো ছাপিয়ে গিয়ে প্যান্ডেলই এখন প্রথম সারিতে জায়গা করে নিচ্ছে| চারপাশে রঙচঙে ফানুস| আর আমরা তাতেই উদ্বেলিত| ক্রমশঃ কমছে বেলুন, আর ক্যাপ ফাটানো বন্দুক নিয়ে খেলা| হারিয়ে যাচ্ছে শুভ বোধ| সবকিছুতেই এখন লোক দেখানো মেকি আন্তরিকতা| পুজোর নামে লাগামছাড়া মাতাল উল্লাস|

    একে অপরের কল্যাণ কামনাই যে সার্বজনীন পুজগুলোর মূল উদ্দেশ্য তাই আজ আমরা ভুলতে বসেছি| শক্তিমান ও ক্ষমতা লোলুপদের শক্তির দ্বন্দে আর অর্থগৃধুগ্নতায় অনেক গুনী ব্যক্তিরাই শেষ পর্যন্ত সরে দাড়ায়| চাঁদা আদায়ের নামে অনেক সময় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও অক্ষম মানুষের উপরে জুলুম, প্রতিযোগিতার নামে পাড়ায় পাড়ায় রেষারেষি পুজোর পবিত্রতা কতটা ধরে রাখে সেটাই ভাবার| আর এভাবেই আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলতে থাকি নিজেদের মূল্যবোধ| যা হচ্ছে হোক – এই মানসিকতাই হারিয়ে দেয় আমাদের|

    কেন পারিনা আমরা এক বছর প্যান্ডেলের, পুজোর জৌলুস বন্ধ রেখে কাশ্মীরের বন্যা দুর্গতদের পাশে দাড়াতে কিংবা ওই ছোট ছেলেটাকে একটা সুস্থ জীবন দিতে| বেলুন হাতে একদিন না হয় ছুটুক ই রেল লাইন ধরে কাশফুলের স্পর্শে নতুন কোন দিশায়| পারস্পরিক মেলামেশার আয়োজনে ব্যাপ্তি লাভ করুক| ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্র প্রসারিত হোক, সম্প্রসারিত হোক হৃদয়| হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলছি অনেক কিছুই, তবু নতুনও তো কিছু পাওয়ার আশা করা যেতেই পারে| কোন একদিনের কর্মসূচী নিয়ে নয়, অন্তর থেকে| ভালবাসায় ভরে উঠুক শারদ আকাশ| সত্যি করেই হারিয়ে যাক সমস্ত অশুভ||

দুর্গাপুজোর কিছু অজানা কথা

আবার শারদাআকাশে মেঘেদের খেলা, পেঁজা তুলোর মত মেঘের এদিক ওদিক উড়ে ফেরা| নতুন জামা-কাপড়, কাশের দোলা, আর আশ্বিন মাসের বারতা মনে করিয়ে দেয় – মায়ের আগমনী|

   দুর্গাপুজো এখন আর শুধু মাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, পুনর্মিলন উত্সব| মনকে পুনরুজ্জীবিত করার আর একটা আবেগ| ব্যবসার প্রসার| রাজনীতিও| দশ দিনের উপাসনা হলেও সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী – এই চার দিনই উল্লাস, আড়ম্বরের সাথে পালন করা হয়| অনেক আনন্দ করলেও দুর্গাপুজোর অজানা অনেক কথাই আমরা অনেকেই জানিনা|

   রাবনের সাথে যুদ্ধে যাবার আগে রাম দেবীর বন্দনা করেছিলেন| সেই আচার সম্বন্ধীয় উত্সব প্রচলিত দুর্গাপুজোর থেকে একটু আলাদা| রামের মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা, ১০৮টি নীল্ পদ্ম আর ১০৮টি দীপ জ্বালানোর সূচনা; বসন্তকালে হয় – ‘অকাল বোধন’ নামে যা পরিচিত|

   দুর্গাদেবীর আরাধনা বিখ্যাত হয় ১৫০০ শতকের শেষ দিকে| কথিত আছে দিনাজপুর আর মালদহের জমিদার বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজো করেন| শোনা যায় ১৬০৬ সালে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ন কিংবা নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার প্রথন শারদীয় দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত করেন| ১৭৯০ সালে হুগলীর গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিয়ে পুজো শুরু করে, যা বারো-বন্ধুর (আরবীতে  ঈয়ার) পুজো এবং পরে তাই ‘বারোয়ারী’ পুজো হিসেবে প্রচলিত হয়| মুর্শিদাবাদে ১৮২৪ থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত পুজো করার পর কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ ১৮৩২ সালে কলকাতায় প্রথম বারোয়ারী পুজো নিয়ে আসেন| এম. ডি. মুথুকুমারস্বামীর লেখা থেকে জানা যায় ‘সনাতন ধর্মত্সহিনী সভা’ কোলকাতার বাগবাজারে সর্বপ্রথম সার্বজনীন পুজোর রূপ দেয় সম্পূর্ণ ভাবে সাধারণ মানুষের সাহায্য নিয়ে| সেটা ছিল ১৯১০ সাল| তখন থেকেই দুর্গাপুজো এক অন্য মাত্রা পেতে থাকে|

   ১৭৬৫ থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহ বৃটিশরাও এই পুজোয় অংশ গ্রহণ করতেন| তারপর তত্কালীন সরকার থেকে আইন করে যা বন্ধ করে দেওয়া হয়|

   দূর্গা সহ কার্ত্তিক, গনেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী-কে নিয়ে মাটির তৈরী যে মূর্তি তৈরী করা হত তা ‘এক-চালা’ নামেই প্রচলিত| মাটি দিয়ে তৈরী প্রতিমাকে সুসজ্জিত করার জন্য দুই রকম সাজ ব্যবহার হত – সোলার সাজ আর ডাকের সাজ| প্রথা অনুযায়ী শোলার সাদা অংশ দিয়ে নকশা করে প্রতিমা সাজানো হয়| পরবর্তী সময়ে আর্থিক উন্নতির সাথের সাথে অপেক্ষাকৃত দামী রাংতার ব্যবহার শুরু হয়| এই রাংতা জার্মান থেকে ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতে এসে পৌছাত, তাই নাম হয় ডাকের সাজ|

Friday, June 6, 2014

আবির শিশিরে

উড়ছে ধুলো পুড়ছে খই
জ্বলছে শিশির আবির কই
পেটে খিদে মুখে লাজ
ডাকছে আলো সুখে ভাঁজ
খেলছে পাখি ভাসছে জল
নিভছে আয়ু খুঁজছে তল

জ্বলছে শিশির আবির কই
মেলছে ডানা সব তাতেই

তোমাকে চাইনি বলেই

তোমাকে চাইনি বলেই এত উৎসাহ
নেমে আসা বৃষ্টিতে তীব্র দাবদাহ
আদিম অজগর ফুঁসে ওঠে রাগে
তবু আছি, ধরে রেখেছি আবেগে

এত উত্তাপ কেন তোমার ওই না ভেজা চোখে
ঘাসের আগায় ফড়িং খেলা করে আজো সুখে

Saturday, May 31, 2014

আগুনে ভিজুক তোর্ চোখ



মাঠ থেকে ভেসে আসে উল্লাস ধ্বনি
পছন্দের দল জিতে গেছে, ফাতে পটকা
তবু তুই শুকনো চোখে চেয়ে থাকিস পথে
আগুনে ভিজুক তোর্ চোখ

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি রেণু ভেসে বেড়ায় বাতাসে
বৃষ্টি শেষে স্বস্তি, মাথা নাড়ে সবুজ ধান
তবু ভিজে শরীরে অপলক শুন্য দৃষ্টি
আগুনে ভিজুক তোর্ চোখ

যারা চলে গেছে ফিরবে না কোনদিনও
শুধু বেঁচে থাকা জীবনে বয়ে চলে সময়
তবু উদ্বেল মন পাড়ি দেয়, আপসহীন যাত্রা
আগুনে ভিজুক তোর চোখ

(সব অভিমান পুড়ে যাক নির্বাক স্নিগ্ধতায়
শুদ্ধ হোক সে পাপ নিবারিত জঠর জ্বালায়
তবু আরেক বুক বেঁধে নিক প্রেমহীন ভালবাসা
আগুনে ভিজুক তো চোখ)

ভিজে গেছে



ভিজে গেছে
বারান্দায় মেলে রাখা আটপৌরে শাড়ি
দমকা হাওয়ায় কার্নিসে আটকে পরা চাদর
আর বেখেয়ালে হেঁটে চলা এই আমি|
আর তখনও
রাস্তার ধারে বৃষ্টি আগলে বসে
খুচরো পয়সা গুনে চলে যে ভিখিরি বুড়ি মা
যেটুকু চেয়েছ, মুঠো ভরে সব দিয়ে যেতে চাই
দুপুর বা জেগে থাকা অসুখের রাতগুলো
কতদিন কতখানি পেরোলে ভুলে যেতে পারি সব

ভিজে গেছে
ধুলো মাখা পথ যতদূর যায়
ভেসে বেড়ায় উষ্ণ মাটির সোদা গন্ধ
আর হঠাত্ কোনো এক প্রান্তে এই আমি|
আর তখনও
রাস্তার ধারে জুবুথুবু বোকা
ভালবাসা কিছু পাব বলে
হাত পেতে বসে থাকি
মুঠো জল, যেটুকু চেয়েছ সবটুকু দিয়ে দিই|

বৃষ্টি নামল




বৃষ্টি নামল|
ভিজিয়ে দিয়ে গেল
বুক পকেটে রাখা বিবর্ণ চিরকুট-টা|
কথা ছিল ভাঁজে ভাঁজে
যখন কেটে কয়েক টুকরো হয়ে যাবে
আরও কিছু টুকরো করে উড়িয়ে দেব
অচেনা কোন পাহাড়ের ওপর থেকে,
ভাসতে ভাসতে কোন টুকরো হয়তো
ছুঁয়ে দেবে উড়ে ফেরা এক ফালি মেঘকে

অনেক গোপন কথা জমানো আছে
কথা ছিল সময় করে
সব কিছু লিখে হালকা করে ফেলবো
মনের কুঠুরিগুলো আর বুক পকেট-টা;
বৃষ্টি নামল|
ভিজিয়ে দিয়ে গেল
বুক পকেটে রাখা সেই-সব ভাবনাগুলো-ও|

বৃষ্টি নামল|